বিটকয়েন কি?১ বিটকয়েন সমান বাংলাদেশের কত টাকা?

বিটকয়েন কি?(What is bitcoin?)

বিটকয়েন (Bitcoin) হলো বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং সর্বপ্রথম মুক্ত সোর্স ক্রিপ্টোকারেন্সিএটি একটি ডিজিটাল মুদ্রা।এটি কোন দেশের সরকার বা কোন প্রতিষ্ঠান কর্তৃক ইস্যু করা হয় নি।সাতাশি নাকামোতা(ছদ্মনাম) নামের একজন জাপানিজ কম্পিউটার প্রকৌশলী ২০০৯ সালে বিটকয়েন চালু করেন।এটি কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় না।এই ভার্চুয়াল মুদ্রায় শুধু দুইজন গ্রাহকের মধ্যে লেনদেন হয়।এবং অন্য কারো পক্ষে এ সম্পর্কে জানা সম্ভব না।কারন একটি একটি ক্রিপ্টোকারেন্সি।বিটকয়েন কি সেটা জানতে হলে ক্রিপ্টোকারেন্সি সম্পর্কে জানা জরুরি।যে প্রযুক্তির মাধ্যমে বিটকয়েনের লেনদেন সম্পন্ন হয় সেটির নাম “ব্লকচেইন” প্রযুক্তি।

১ বিটকয়েন বাংলাদেশে কত টাকা

সংখ্যা নির্ধারিত হওয়ায় প্রতিটি বিটকয়েনের দাম বর্তমানে আকাশচুম্বি।বর্তমানে ১ বিটকয়েনের দাম ৪৮,৩৭৫.৬০ মার্কিন ডলার(২২ ডিসেম্বর,২০২১)।
বাংলাদেশের টাকায় যার মূল্য প্রায় ৪১৪৫৬৪৭ টাকা ।এটি প্রতি মুহুর্তে পরিবর্তন হতে পারে।এখন পর্যন্ত বিটকয়েনের ইতিহাসের সর্বোচ্চ দাম হয়েছিল ২০২১ সালের ৭ ই নভেম্বর।একটি বিটকয়েনের দাম সেদিন $৬৭৫৪৯.১৪ হয়েছিল।বাংলাদেশে টাকায় যার মুল্য ৫৭৭৫৫০০ টাকার কাছাকাছি।তাহলে চিন্তা করে দেখুন বিটকয়েনের জনপ্রিয়তা এবং চাহিদা কতটা বেশি।শেয়ারবাজারের মত বিটকয়েনেও বিনিয়োগ করে অনেক লাভবান হওয়া যায়,তবে যেহেতু বিটকয়েনের দাম পরিস্থিতি অনুসারে বাড়ে কমে সেহেতু ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনাও আছে।

বিটকয়েনের বিকল্প আছে কি?

বিটকয়েনের জনপ্রিয়তার কারনে আরো বেশ কিছু ক্রিপ্টোকারেন্সি বাজারে এসেছে।এদের কয়েকটি ইতিমধ্যে বেশ জনপ্রিয় হয়েছে এবং বিটকয়েনের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বাজারে জায়গা দখল করছে।এরকম কয়েকটি ক্রিপ্টোকারেন্সি হলঃ

  • ইথেরিয়াম(Ethereum)
  • লাইটকয়েন(Litecoin)
  • বিটকয়েন ক্যাশ(Bitcoin Cash)
  • ডগিকয়েন(Dogecoin)
  • স্টেলার(Staller) ইত্যাদি

বিটকয়েন ও ক্রিপ্টোকারেন্সি

ক্রিপ্টোকারেন্সি(Cryptocurrency) একটি ইংরেজি শব্দ।যার বাংলা করলে হয় “গোপন মুদ্রা”।বিটকয়েন সোনা,রুপা এবং ডলার বা টাকার মতই বিনিময় যোগ্য কিন্তু পুরো ব্যাপারটা ঘটে অনলাইনে।কোডিং এর মাধ্যমে পুরো ব্যাপারটি নিয়ন্ত্রিত।এই পদ্ধতিটির নাম “ব্লকচেইন”।ব্লকচেইন হচ্ছে স্বশাসিত,কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণহীন,বিভাজিত একটি ডিজিটাল ডাটাবেজ যেটি সবসময় লেনদেনের তথ্য সংগ্রহ করে জমা করতে থাকে এবং এই লেনদেনের রেকর্ড কোনভাবেই পরিবর্তন করা সম্ভব হয় না।যেহেতু এটি কেন্দ্রীয় ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয় বা এককভাবে কেউ নিয়ন্ত্রণ করে না তাহলে অনেকের মনে প্রশ্ন আসতেই পারে যে এই উপায়ে লেনদেন কিভাবে হয়।আসলে সবাই মিলে ক্রিপ্টোকারেন্সির লেনদেনকে ভেরিফাই করে।যারা এই কাজ করে তাদের বলা হয় “মাইনার”।বিটকয়েন অথবা অন্যান্য ক্রিপ্টোকারেন্সির মাইনিং করে অনেকে টাকা ইনকাম করতে পারে।

বিটকয়েন ও ব্লকচেইন প্রযুক্তি

যেহেতু বিটকয়েন একটি ক্রিপ্টোকারেন্সি।তাই এটিও ব্লক চেইন(Block Chain) প্রযুক্তির উপর নির্মিত।ব্লকচেইনের বাংলা করলে হয় ব্লকের তৈরি শিকল।হাজার হাজার কম্পিউটার এই ব্লকচেইন প্রযুক্তির সাথে সংযুক্ত।বিটকয়েন মাইনিং করতে হলে অত্যন্ত শক্তিশালী প্রসেসরযুক্ত কম্পিউটার প্রয়োজন হয়।

বিটকয়েনে কোন লেনদেন হলে ওই লেনদেনটির তথ্য চেইনের সাথে যুক্ত সকল কম্পিউটারে যায়।একই সময়ের সকল লেনদেনের তথ্য একটি ব্লকে ঢুকানো হয়।সেই ব্লকটি বিশেষভাবে তথ্যগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ফলে কোন লেনদেনের তথ্য কোনভাবেই পরিবর্তন করা সম্ভব হয় না।চেইনে যুক্ত সকল কম্পিউটারে তথ্যগুলো জমা থাকায় কেউ চাইলেও এটি পরিবর্তন করতে পারবে না এবং কোন কম্পিউটার যদি অকেজো থাকে তাহলেও লেনদেনে কোন সমস্যা হয় না।প্রতিটি ব্লকেরই একটি ঠিকানা থাকে।এবং একটি ব্লক তার লেনদেনের তথ্য অন্য ব্লকে স্থানান্তরিত করে।একটি ব্লক অন্য একটি ব্লকের সাথে সংযুক্ত থাকে এবং প্রতিটি ব্লক তার পূর্ববর্তী ব্লকের ঠিকানা জানে।এভাবে একটি চেইন আকারে ব্লকের মধ্যে করে লেনদেনের তথ্যটি প্রেরকের কাছে পৌছে।পুরো লেনদেনের তথ্য সকল কম্পিউটারের মধ্যে ব্লক আকারে থেকে যায়।তাই কোন প্রকার কারচুপির সুযোগ নেই।

পিয়ার টু পিয়ার(P2P) পদ্ধতিতে লেনদেন হওয়ায় প্রেরক আর প্রাপক ছাড়া কেউ লেনদেনের কথা জানতে পারে না।তাই অনেক বৈধ এবং অবৈধ কাজে বিটকয়েন দিয়ে লেনদেন করা হয়।মাদক চোরাচালান,অস্ত্র ব্যবসা,টাকা পাচার,মুক্তিপণের টাকা বিটকয়েনের মাধ্যমে লেনদেন করা হয় বলে অনেক দেশে এটি অবৈধ করা হয়েছে।এমনকি বাংলাদেশেও বিটকয়েন অবৈধ।

বিটকয়েনের দাম অনেকটা শেয়ারবাজারের মত উঠানামা করে।পৃথিবীতে বিট কয়েনের সংখ্যা সীমিত।মোট ২১০০০০০০ টি বিট কয়েন মাইনিং করা সম্ভব।তারপরে আর কোন কোন বিট কয়েন মাইনিং করা সম্ভব হবে না।ইতিমধ্যে প্রায় ১৮৯০৭১৪৪ টি বিটকয়েন উত্তোলন করা হয়ে গেছে।(২০২১-১২-২২ তারিখের হিসেবে)আর মাত্র ২০৯২৮৫৬ টি বিট কয়েন বাকি আছে।বিভিন্ন এলগরিদম সমাধান করে মাইনাররা বিটকয়েন উত্তোলন করে।

বিটকয়েনের সুবিধা

  • বিটকয়েনের একটি বড় সুবিধা হলো বিটকয়েন একটি সহজলভ্য এবং মুক্তসোর্স ক্রিপ্টোকারেন্সি।
  • বর্তমানে অন্যসব ক্রিপ্টোকারেন্সি থেকে সবচেয়ে জনপ্রিয়।
  • এটি লেনদেন বেশ সহজ এবং লেনদেনে নিরাপত্তা অনেক বেশি।
  • এটি যেকেনো দেশেই লেনদেনে ব্যবহার করা যায়,কারণ এটি কোন দেশের সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই।
  • বিটকয়েন লেনদেনে সাশ্রয়ী কেননা কোন ধরণের ফি দিতে হয় না।
  • দ্রুত লেনদেন সম্পন্ন করা যায়।
  • বিটকয়েন লেনদেনে জালিয়াতি করার কো সুযোগ নাই।
  • বিটকয়েনের মূল্য এবং গ্রহণযোগ্যতা ক্রমশ বাড়ছে,তাই এটি বিনিয়োগের উপযুক্ত জায়গা হতে পারে।

বিটকয়েনের অসুবিধা

  • বিটকয়েনের লেনদেনে কোনরকম নজরদারি দেওয়া সম্ভব নয় বলে অবৈধ কাজে বিটকয়েন দিয়ে লেনদেন করা হয়।
  • অনেক দেশে এটি অবৈধ ঘোষনা করা হয়েছে।
  • মাদক কারবারি,অস্ত্র কারবারি,অপহরণের মুক্তিপণ আদায় সহ অনেক অবৈধ কাজে বিটকয়েন দিয়ে লেনদেন করা হয়।
  • এটিতে বিনিয়োগে ঝুকি আছে কারণ এর দাম উঠানামা করে।
  • অর্থ পাচারের জন্য বিটকয়েন একটি ভাল মাধ্যম তাই এটি দেশের জন্য ক্ষতিকর।
  • নিয়ন্ত্রণ না থাকায় সরকারের পক্ষে এর লেনদেনের তথ্য জানা সম্ভব হয় না।

বিটকয়েন কি বৈধ নাকি অবৈধ?

বিটকয়েন ২০১৪ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক নিষিদ্ধ করে।যার ফলে বাংলাদেশে বিটকয়েন ক্রয়,বিক্রয় এবং বিনিয়োগ সম্পূর্ণ অবৈধ।তবে অনেক দেশে বিটকয়েনকে বৈধ করেছে।

যেসব দেশে বিটকয়েন বৈধ সেগুলো হলঃ

  • যুক্তরাষ্ট্র
  • ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন
  • কানাডা
  • অস্ট্রেলিয়া
  • এল সালভাদর
  • ডেনমার্ক
  • ফ্রান্স
  • জার্মানি
  • জাপান
  • আইসল্যান্ড
  • মেক্সিকো
  • যুক্তরাজ্য
  • স্পেন

যেসব দেশে বিটকয়েন একেবারেই নিষিদ্ধ

  • আলজেরিয়া
  • চায়না
  • বাংলাদেশ
  • ইরাক
  • মিশর
  • কাতার
  • নেপাল
  • মরক্কো
  • তিউনেশিয়া

যেসব কোম্পানি বিটকয়েন গ্রহণ করে

বেশ কিছু কোম্পানি বিটকয়েন গ্রহণ করে।এসব প্রতিষ্ঠান বিটকয়েনকে বৈধতা দিয়েছে।বিটকয়েন ব্যবহার করে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে কেনাকাটা করা যাবে।এসব প্রতিষ্ঠানগুলো হলঃ

  • উইকিপিডিয়া
  • মাইক্রোসফট
  • বার্গার কিং
  • কেএফসি
  • পিজ্জা হাট
  • অ্যামাজন(সরাসরি নয়)
  • নেমচিপ
  • মিয়ামি ডলফিন
  • টেসলা
  • এক্সপ্রেস ভিপিএন ইত্যাদি

পরিশেষে

বর্তমান সময়ে ভার্চুয়াল কেনাকাটা করার জন্য বিটকয়েন একটি সেরা উপায়।উন্নত দেশগুলো যেখানে ভার্চুয়াল মুদ্রার দিকে ঝুকছে সেখানে বাংলাদেশ বিটকয়েন নিষিদ্ধ করে রেখেছে।বাংলাদেশে যদি বিটকয়েন বৈধ করা হয় তাহলে বিটকয়েনই হবে ফ্রিল্যান্সারদের বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আনার সর্বোত্তম উপায়।শেয়ার বাজারের মত বিটকয়েনেও বিনিয়োগ করে লাভবান সম্ভব।আশা করা যায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক শীগ্রই এ ব্যপারে স্বীদ্ধান্ত পরিবর্তন করবে।

Leave a Comment